ইলেকট্রিক হার্ডওয়্যার মেশিনারির সর্ববৃহৎ পাইকারী বাজার নবাবপুর!

পুরান ঢাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আবর্তিত হচ্ছে কয়েকটি খাতকে ঘিরে। এসব খাত একদিকে যেমন অর্থনীতিতে অবদান রাখছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানেও রাখছে ভূমিকা। ব্রিটিশ আমল থেকেই পুরান ঢাকার নবাবপুর ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে সুখ্যাত ছিল। তবে সেখানে ইলেকট্রিক ব্যবসার প্রসার বেড়েছে স্বাধীনতার পর থেকে যখন বিদ্যুতের দ্রুত ব্যবহার বাড়তে শুরু করেছে।

প্রথম দিকে নবাবপুরে শুধু আজিজ ইলেকট্রিক মার্কেটে এসব পণ্য বিক্রি হতো। কিন্তু গত কয়েক দশকে সেখানে এখন মার্কেটের সংখ্যা হয়েছে শতাধিক। এসবে গড়ে উঠেছে পাঁচ হাজারের বেশি দোকান। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত কয়েক দশক থেকে দেশে ক্রমেই বিদ্যুৎ সুবিধা বাড়ায় ইলেকট্রিক পণ্যের অব্যাহত চাহিদা বেড়েছে।

যোগাযোগ ব্যবস্থা ও আবাসনে এসেছে পরিবর্তন। যার প্রভাব পড়েছে নবাবপুরের ব্যবসায়। গড়ে উঠছে নতুন নতুন ভবন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। চাহিদা বেড়েছে কল-কারখানায় ইলেকট্রিক পণ্যের। একই সঙ্গে এসব কাজেও আগের থেকে এখন অনেক বেশি যান্ত্রিকীকরণ হয়েছে। দৈনন্দিন জীবনে অত্যাবশ্যকীয় বৈদ্যুতিক পণ্যের সঙ্গে সৌখিন পণ্যেরও চাহিদা বেড়েছে দ্রুত।

ফলে সামগ্রিকভাবে দেশে ইলেকট্রিক, হার্ডওয়্যার ও মেশিনারির বড় বাজার তৈরি হয়েছে। বর্তমানে যার উল্লেখযোগ্য অংশ সরবরাহ হচ্ছে এই নবাবপুর থেকে। এতে নবাবপুর হয়ে উঠেছে দেশের ইলেকট্রিক পণ্যের পাশাপাশি হার্ডওয়্যার ও মেশিনারি পণ্যেরও সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ব্যবসায়ী সংগঠনের তথ্যমতে, বর্তমানে নবাবপুরে শতাধিক আলাদা মার্কেট রয়েছে।

যার মধ্যে অধিকাংশই ইলেকট্রিকপণ্যের। সঙ্গে হার্ডওয়্যার ও মেশিনারিজ পণ্যের কেনাবেচা হয় এক-তৃতীয়াংশ মার্কেটে। সামগ্রিকভাবে এখানে প্রায় পাঁচ হাজার ছোট-বড় দোকান গড়ে উঠেছে। এছাড়া বর্তমানে নবাবপুরে বিপণন ও উৎপাদনের অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। সব মিলে প্রতিদিন নবাবপুরে কয়েক কোটি টাকার লেনদেন হয়। সঙ্গে হয়েছে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান।

বাসাবাড়ির বৈদ্যুতিক সুইচ থেকে শুরু করে সার্কিট, কেব্ল্, লাইট, ফ্যান, পাম্প বা জেনারেটরের মতো সব উপকরণই পাওয়া যায় এসব মার্কেটে। আবার ইলেকট্রিক কাজের জন্য ব্যবহৃত প্লায়ার্স বা ড্রিল মেশিনের মতো পণ্যও মেলে। শুধু তা-ই নয়, এসব পণ্যের পাশাপাশি অফিস বা কারখানার জন্য অগ্নিনির্বাপণে ব্যবহৃত সব ধরনের যন্ত্রাংশ, সিকিউরিটি সিস্টেমের যন্ত্রাংশসহ রক্ষণাবেক্ষণের যন্ত্রাংশগুলো কেনাবেচা হয় নবাবপুরে।

সরেজমিনে নবাবপুর ঘুরে দেখা গেছে, গুলিস্তান থেকে দক্ষিণে চলে আসা নবাবপুর সড়কের দুই পাশে সারি সারি দোকান। কথিত রয়েছে, ইলেকট্রিকের এমন কোনো পণ্য নেই, যা এখানে পাওয়া যায় না। প্রতিদিনই সারা দেশের খুচরা কিংবা পাইকারি ব্যবসায়ীরা পণ্য কিনতে সেখানে ভিড় করছেন। আগে এই প্রধান সড়কেই মার্কেট জমলেও এখন দিন দিন বাড়ছে এর পরিসর।

মূল সড়ক থেকে প্রায় সব অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়ছে দোকান। কথা হয় পুরোনো ব্যবসায়ী একাব্বর হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার পর থেকে ইলেকট্রিক পণ্যের বাজার নবাবপুরে জমতে থাকে। সে সময় আজিজ ইলেকট্রিক মার্কেটে এসব পণ্য বিক্রি হতো। এখন বিভিন্ন অলিগলি পর্যন্ত ব্যবসাটি ছড়িয়ে গেছে। দেশে এত বড় মার্কেট আর কোথাও নেই। দেশের সব এলাকায় নবাবপুরের পণ্য যায়।’

ব্যবসায়ীরা জানান, আগে দেশের বাইরে থেকেই বেশিরভাগ ইলেকট্রিক পণ্য আমদানি হতো। আমদানি পণ্যের ব্যাপকতা ছিল বেশি। কিন্তু এখন সে ধারার পরিবর্তন হচ্ছে। প্রচুর দেশি কোম্পানি নবাবপুরে পণ্য সরবরাহ করছে। এখন দেশি পণ্যের কেনাবেচা ভালো। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক তার, সুইচ, সকেট, মাল্টিপ্লাগ, ফিটিংসসহ বিভিন্ন মানসম্পন্ন যন্ত্রাংশ দেশেই তৈরি হচ্ছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইলেকট্রিক্যাল মার্চেন্টস অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি কামাল হোসেন বলেন, ‘দেশের ইলেকট্রিক পণ্যের চাহিদার বড় অংশই জোগান দিচ্ছেন নবাবপুরের ব্যবসায়ীরা। বৈদ্যুতিক ও প্রযুক্তিপণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহে এখানকার ব্যবসায়ীদের অবদান অনেক। এখানে হাজারো রকমের পণ্যের সর্বোচ্চ সমাহার রয়েছে।’

জয়পুরহাট থেকে পণ্য কিনতে আসা ব্যবসায়ী সাব্বির আহম্মেদ বলেন, ‘এখানে একটি দোকানে বসেই ছোটখাটো সব পণ্য কেনা যায়। যা অন্য কোথাও সম্ভব নয়। মাসে নবাবপুরে অন্তত একবার যেতেই হয় সব ব্যবসায়ীকে। যাচাই-বাছাই করে মানসম্মত পণ্য সঠিক দামে কেনার একমাত্র জায়গা নবাবপুর। তাই এ বাজারে ভরসা করেন আমাদের মতো ব্যবসায়ীরা।’

তবে নবাবপুর দোকান মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি কামাল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ব্যবসা বাড়ার সঙ্গে যানজটের কারণে নাকাল নবাবপুর। এতে ব্যবসায়িক ক্ষতি হচ্ছে। সরকার এ বাজার থেকে প্রচুর ভ্যাট ও রাজস্ব আদায় করছে। ব্যবসায়ীরা সুবিধা পাচ্ছেন কম।’

বাংলাদেশ ইলেকট্রিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘নবাবপুরে একই সঙ্গে উৎপাদক ও আমদানিকারকের পণ্য বিক্রি হয়। এতে এ বাজারে প্রতিযোগিতার সুষ্ঠু পরিবেশ বেড়েছে। উৎপাদিত ও আমদানি করা পণ্য একই সঙ্গে বাজারে থাকায় সঠিক দামে পণ্য পাচ্ছেন ক্রেতারা।’

জানা গেছে, নবাবপুরকে কেন্দ্র করে পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে কয়েকশ বৈদ্যুতিক পণ্য তৈরির কারখানা। এসব কারখানায় তৈরি পণ্য উৎপাদকদের বিক্রিতে সব থেকে বড় ভরসা নবাবপুরের ব্যবসায়ীরা। শুধু ঢাকায় নয়, দেশের অন্যান্য এলাকায় তৈরি ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশও বিক্রি হয় নবাবপুরে। বৈদ্যুতিক পণ্য সরবরাহে নবাবপুর দেশের সবচেয়ে বড় উৎস।

এখানকার ব্যবসায়ীরা চাহিদা অনুযায়ী সেসব কারখানা থেকে পণ্য এনে দেশের সব বাজারে সরবরাহ করছেন। অপরদিকে প্রচুর অর্থ লেনদেনের কারণে নবাবপুরে গড়ে উঠেছে দেশের প্রায় সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শাখা। বাংলাদেশ ইলেকট্রিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানিয়েছে, এ সমিতির সদস্য সাড়ে পাঁচ হাজার। যার মধ্যে গত নির্বাচনে ভোটার ছিলেন তিন হাজার ৭২৮ জন। একজন সদস্যের একাধিক দোকানও রয়েছে। তথ্যসূত্র- শেয়ারবিজ।

Check for details
SHARE