‘ইনভেস্টর’ ভিসায় আরব আমিরাতে ব্যবসা!

মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে আধুনিক দেশ হিসেবে পরিচিত সংযুক্ত আরব আমিরাত। ২০১২’র অগাস্ট থেকে দেশটির শ্রমবাজার বন্ধ করে দেয়া হয় বাংলাদেশিদের জন্য। তবে, এখনো বাংলাদেশিদের ব্যবসা, কাজ করা ও থাকার সুযোগ রয়েছে সেখানে। শ্রমিক ভিসা বন্ধের পর হয়তো অনেকেই এ সুযোগগুলোর কথা জানেন না। সীমিত পরিসরে হলেও বাংলাদেশিদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে আরব আমিরাতের শ্রমবাজার। এর মধ্যে একটু ব্যয়বহুল হলেও সবচেয়ে সুবিধাজনক ‘ইনভেস্টর ভিসা’। এ ভিসায় বাংলাদেশ থেকে আমিরাতে গিয়ে বাংলাদেশিরা যেকোন ব্যবসা বা চাকরি করতে পারবেন।

আরব আমিরাত প্রবাসী এবং দুবাই-এর একজন সফল নারী উদ্যোক্তা শেফালী আক্তার আঁখি জানান, ইনভেস্টর ভিসা কিছুটা ব্যয়বহুল হলেও এ মুহূর্তে এটাই বাংলাদেশিদের জন্য, দেশটিতে থাকার এবং প্রতিষ্ঠা পাওয়ার সেবচেয়ে ভালো উপায়। ইনভেস্টর ভিসা পেতে প্রথেমে ভিজিট ভিসায় আরব আমিরাতে যেতে হয়, তারপর সেখানকার কোন কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান থেকে ইনভেস্টর ক্যাটাগরিতে ভিসা নিতে হয়। এক্ষেত্রে আরব আমিরাতে থাকা পরিচিত কোন ব্যক্তি বা বিশ্বস্ত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে এই ভিসা প্রক্রিয়া করা যায়।

শেফালি বলেন, পুরো প্রক্রিয়া শেষ করে ইনভেস্টর ভিসা পেতে ১০ থেখে ১২ লাখ টাকা খরচ হয়। এ ভিসা দেয়া হয় তিন বছরের জন্য। মেয়াদ শেষে সহজেই আবার রিনিউ বা ভিসার মেয়াদ বাড়ানো সম্ভব বলে জানান তিনি। ইনভেস্টর ভিসার আ্ওতায় আরব বিশ্বের সর্বাধুনিক এই দেশটিতে থাকা, ব্যবসা, চাকরি, ব্যাংক একাউন্ট খোলা ও ঋণ নেয়া থেকে শুরু করে বাড়ি গাড়ি সবই কেনা যায়। তবে শেফালী আক্তার জানান, আরব আমিরাতে সারাজীবন থাকলেও, অন্য কোন দেশের মানুষকেই সেখানকার নাগরিকত্ব দেয়া হয়না। শুধুমাত্র কোন নারী যদি সেদেশের কোন পুরুষকে বিয়ে করে তাহলে সে আমিরাতের নাগরিকত্ব পাবে। তবে বিদেশি পুরুষরা এ সুযোগ পাবেনা।

সফল এই নারী উদ্যোক্তা জানান, ইনভেস্টর ক্যাটাগরির বাইরেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের এখনও ভিসা দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে বাংলাদেশি নারীরা গৃহকর্মী এবং পুরুষরা ড্রাইভার ও কুক বা বাবুর্চি হিসেবে আরব আমিরাতে কাজ করার ভিসা পাচ্ছে। যাকে বলা হয় ‘এমপ্লয়মেন্ট’ ভিসা। এই ভিসার মেয়াদ দুই বছর। মেয়াদ শেষে তা আবার বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। আরব আমিরাতের স্থানীয় কোম্পানিগুলো তাদের কর্মী চাহিদা ও প্রয়োজন অনুযায়ী এই ভিসা দেয়, এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কর্মীকে সেখানে নেয়ার বিমান ভাড়াসহ ভিসা প্রক্রিয়া করার সব খরচ চাকরিদাতা কোম্পানি বহন করে।

শেফালি বলেন, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপিন্সসহ অন্য সব দেশের কর্মীদের ক্ষেত্রে পুরোপুরি এ নিয়ম মানা হয় অর্থাৎ তাদের আরব আমিরাতে পৌঁছানো পর্য্ন্ত সব খরচ সংশ্লিষ্ট কোম্পানি বহন করে। কিন্তু বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে বাগড়া বাধায় রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশিদের সাথে সেদেশের কোম্পানিগুলোর সরাসরি যোগাযোগের ব্যবস্থা নেই। আর সে সুযোগটাই নেয় রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো। উল্টো নিজের পকেট থেকে লাখ লাখ টাকা খরচ করে আরব আমিরাতে যেতে হয় বেশিরভাগ বাংলাদেশি কর্মীদের।

দুবাই প্রবাসী এই তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী জানান, ভিজিটর, ইনভেস্টর, হাউজকিপিং, ড্রাইভিং এবং কুক বা বাবুর্চি এই পাঁচ ক্যাটাগরিতেই এখন বাংলাদেশিদের আরব আমিরাতের ভিসা পা্ওয়ার সুযোগ রয়েছে। বাকি সব ক্যাটগরির ভিসা দীর্ঘদিন ধরেই বন্ধ। অথচ ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কাসহ অন্য সব দেশের জন্য আমিরাতের শ্রমবাজার পুরোপুরি খোলা। বরং বাংলাদেশিদের জন্য বন্ধ থাকায়, এসব দেশ থেকে আগের চেয়ে আরো বেশি দক্ষ-অদক্ষ শ্রমিক আনছে দেশটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। শেফালি নিজের প্রতিষ্ঠানের জন্যও বাধ্য হয়ে এসব দেশ থেকেই কর্মী নিচ্ছেন। তার মতে, এতে বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে বাংলাদেশের, আমাদের দেশ হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রেমিটেন্স বা প্রবাসী আয়।

অন্য দেশের শ্রমিকদের কোন ধরনের সমস্যা হলে সে দেশের সরকার বা দূতাবাস তা সমাধানে সাথে সাথেই কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের বেলায় তার উল্টো বলে অভিযোগ করেন আমিরাত প্রবাসী শেফালি। বাংলাদেশিদের কোন সমস্যা হলে দীর্ঘদিন তা ঝুলে থাকছে। তাদের সহায়তা বা সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছেনা দূতাবাসের পক্ষ থেকে।

সৌদি আরবের পরই বাংলাদেশের অন্যতম বড় শ্রমবাজার সংযুক্ত আরব আমিরাত। হঠাৎ করেই ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশিদের জন্য এই দেশটির শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়ে দেশটিতে থাকা লাখ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী। বড় ধরনের প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের রেমিটেন্স খাতেও। শ্রমিকের অভাবে এবং অন্যদেশের শ্রমিক নেয়া অনেক ব্যয়বহুল হওয়ায় আমিরাতে অনেক বাংলাদেশি ব্যবসায়ী বাধ্য হয়ে ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছে। ভালো বেতনের চাকরি থাকলেও, ট্রান্সফারেবল ভিসা বা ভিসা পাল্টানোর সুযোগ না থাকায় চাকরি পরিবর্তনও করতে পারছেন না অনেকে।

বাংলাদেশিদের ভিসা বন্ধ হওয়ার কারণ হিসেবে এই আরব আমিরাত প্রবাসী মনে করেন, অনেক সময়ই বাংলাদেশি শ্রমিকরা তাদের কাজের ক্ষেত্রে সৎ না। যে প্রতিষ্ঠান থেকে তাকে ভিসা দিয়ে চাকরির জন্য নেয়া হচ্ছে, সেই প্রতিষ্ঠানকে কিছু না বলেই ভালো বেতনের অফার পেলে অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যাচ্ছে। যেটা অনৈতিক এবং ভিসার শর্ত লঙ্ঘন বলে জানান তিনি। শেফালি আক্তার বলেন, এসব ক্ষেত্রে অন্য দেশের শ্রমিকরা অনেক দায়িত্বশীল। তারা চাকরি পরিবর্‌তন করতে চাইলে সব নিয়ম মেনে, কর্মরত প্রতিষ্ঠানের অনুমতি নিয়ে তারপর অন্য প্রতিষ্ঠানে যোগ দেয়। এছাড়া, অন্য দেশের শ্রমিকরা অপরাধমূলক কাজ করলেও বাংলাদেশি শ্রমিকদের অপরাধটা বেশি প্রকাশ পেয়েছে। এসব মিলিয়ে বাংলাদেশিদের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে বন্ধ করে দেয়া হয় বাংলাদেশিদের জন্য বিশাল এই শ্রমবাজার।

উলেখ্য, আমিরাতের বর্তমানে বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় দশ লাখ। এক জরিপে দেখা যায়, ২০১০ সাল থেকে ২০১২ পর্য্ন্ত প্রতি মাসে গড়ে ত্রিশ থেকে তেত্রিশ হাজার বাংলাদেশি কর্মী আরব আমিরাতে যেতো। আর এই ধারা এখনো অব্যাহত থাকলে দেশটির শ্রমবাজারে যুক্ত হতো ১৫ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক। অর্থাৎ বছরে গড়ে সাড়ে তিন লাখ নতুন শ্রমিক যেতো মধ্যপ্রাচ্যের ইউরোপ খ্যাত এই দেশটিতে। জনপ্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা পাঠালেও বছরে রেমিটেন্স আসতো সাড়ে আটশো কোটি টাকা। আর একই হারে শ্রমিক যাওয়া অব্যাহত থাকলে, এই রেমিটেন্স প্রতি বছরই প্রায় দ্বিগুন হারে বাড়তো।

তাই শেফালির মতো আরব আমিরাত প্রবাসী অনেকের মতেই, গুরুত্বপূর্ণ্ এই শ্রমবাজার বাংলাদেশিদের জন্য আবার উন্মুক্ত করতে সরকারের আরো বেশি উদ্যোগী ও দ্রুত কার্য্কর পদক্ষেপ নেয়া উচিত। আমিরাত প্রবাসী বাংলাদেশিরা মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে আরব আমিরাত সফর করে সেখানকার সরকারের সাথে আলোচনা করলেই এ সমস্যার সমাধান হবে।

তথ্যসূত্র: ভয়েস বাংলা ডটকম।

Check for details
SHARE