অলসতা কাটানোর সেরা উপায়!

অলসতা একটি ভয়ংকর রোগ। আর এ রোগের নিয়মিত রোগী অনেকেই। এ রোগ দেহে একববার বাসা বাধলে তাকে নির্মুল করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। প্রথমে এর বিস্তার শরীরের ছোট্ট অংশকে ঘিরে হলেও ধীরে ধীরে এর ভয়ংকর শিকড়গুলো ছড়িয়ে পরে রন্ধ্রে রন্ধ্রে। আর এর কবলে পড়ে মানুষ তার কাজ করার ক্ষমতাকে হাড়িয়ে ফেলে। কাজের প্রতি অনিহা সৃষ্টি হয়। সক্রিয় মস্তিষ্কটাকে বিকলগ্রস্থ করে তোলে। অলসতার চাদর মুড়িয়ে নেয় পুরো শরীর। গ্রাস করে ফেলে সর্বস্ব।

সাফল্যের সিড়িকোঠা থেকে ছিটকে ফেলে দেয় ব্যর্থতা নামক তিক্ত রাস্তায়। আর তখন অনিচ্ছা সত্ত্বেও কপালে লেপতে হয় ব্যর্থতার তিলক। সাফল্যের পথের সবচেয়ে বড় বাধা হলো অলসতা। অলস ব্যক্তি কখনোই সাফল্যের শীর্ষচূড়ায় উঠতে পারে না। তাই সাফল্যের স্বাদ গ্রহন করতে হলে অলসতার বীজ উপ্রে ফেলে দিতে হবে। আর তাহেই সাফল্যের স্বর্ণশিখড়ে অবতরণ করা সম্ভব। নিচে ১০ টি কৌশল সঠিকভাবে অবলম্বন করলে আপনিও অলসতার জাল ছিড়ে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হবেন।

১। ডিজিটাল ডায়েট
শিশু-কিশোরদের নিয়ে জার্মানির টেশনিকার স্বাস্থ্যবিমা কোম্পানির করা এক সমীক্ষা থেকে জানা গেছে যে শতকরা ১৭ জনই স্বীকার করেছে, দিনে কয়েক ঘণ্টা অনলাইন থেকে দূরে থাকলে ওদের কিছু একটা হারিয়ে যাওয়ার মতো ভয় হয়, যে অনুভূতি দিন দিন বাড়ছে৷ সমাজের এই চাপ থেকে বেরিয়ে আসতে তরুণদের প্রতি জার্মানির মোটিভেশন ট্রেনার গাব্রিয়েলে ভিনকে-র পরামর্শ ‘ডিজিটাল ডায়েট’, অর্থাৎ সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার কিছুটা কমিয়ে দিতে হবে৷

২। এক্সারসাইজ
এক্সারসাইজ বা শরীরচর্চা আপনার অলসতাকে দূর করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং কার্যকারী মাধ্যম। আমরা অনেকেই অলসতার কারনে সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি করি। যার কারনে প্রত্যেকদিন আমরা আমাদের অনেক মূল্যবান সময় হারিয়ে ফেলি। যা আমাদেরকে আমাদের লক্ষ হতে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়। সময়ের অপব্যবহার করলে ফলাফল যে আশা অনুরূপ হয় না, সে কথা আমাদের অজানা নয়। তাই আমাদের সকালে ঘুম থেকে উঠে কমপক্ষে ১ ঘন্টা এক্সারসাইজ করা প্রয়োজন। তার ফলে আমাদের অলসতা দূর হবে। এবং অলসতা দূর হওয়ার পাশাপাশি আমাদের শরীরও সুস্থ এবং সবল থাকবে।

৩। বিছানা এড়িয়ে চলুন
বিছানা অলসতা আয়নের ক্ষেতে একেবারে ওস্তাদ। বিছানায় যাবেন আর অলসতা অনুভব করবেন না এমনটা কখনোই হয় না বললেই চলে। কেননা আমরা সারাদিন যত কাজ করি তার মধ্যে ৯০% এরও বেশি কাজ নিয়ন্ত্রিত হয় আমাদের সাবকন্সিয়াস মাইন্ডের দ্বারা। অর্থাৎ আমাদের সে কাজ গুলো ভেবে ভেবে করতে হয় না। আমরা অটোমেটিক সেগুলো করে ফেলি। তাই যেই বিছানায় আপনি ঘুমান, সেই বিছানাতেই যদি আপনি সারাদিন শুয়ে বয়ে কাটান তাহলে সারাদিনই আপনার মস্তিষ্কের কাছে সিগনাল যেতে থাকে এটা বোধয় ঘুমানোর সময়। যার ফলে আপনার সাবকন্সিয়স মাইন্ড কনফিউজড থাকে আর সে সিগনাল দিতে থাকে ঘুমের জন্য। যে কারনে আপনি সারাদিন অলসতা অনুভব করেন। তাই ঘুম থেকে উঠার পর এবং পুনরায় ঘুমাতে যাওয়ার আগে আপনাকে বিছানা এড়িয়ে চলতে হবে, এবং আপনাকে বিছানার বিকল্প পদ্ধতি খুজে নিতে হবে। এক্ষেত্রে আপনি মেঝেতে মাদুর বা কারপেট জাতীয় কিছুতে বসে যে কোন কাজ করুন। মেঝেতে বসে কাজ করলে আপনি যে শুধু অলসতাকেই বিদায় করবেন তা নয় তার সাথে সাথে আপনি অনেক উপকারও পাবেন।

৪। বড় কাজগুলোকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে নিন
বড় কোন কাজের ক্ষেত্রে সময়টা একটু দীর্ঘায়িত হয়ে থাকে। যার ফলে অনেক সময় নিয়ে কাজ করতে হয়। যেটা আপনার কাজে একঘেয়েমি মনভাব তৈরী করে। আর এই একঘেয়েমি মনভাব অলসতা সৃষ্টিতে সহয়তা করে। যার ফলে আপনার কাজে অলসতার অশুভ ছায়া পরবে। যেটা আপনার কাজে ব্যাঘাত ঘটবে। অপর দিকে আপনি যদি এই বড় কাজটিকে ছোট ছোট অংশে বিভক্ত করে কাজ করেন সে ক্ষেত্রে আপনার কাজে কখনই একঘেয়েমিটা আসবে না এবং আপনি আনন্দের সাথে কাজটিকে শেষ করতে পারবেন। তাই আমাদের অলসতাকে বিদায় জানাতে বড় কাজগুলোকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে নেয়াই ভালো।

৫। ইতিবাচক ফলাফল আশা করুন
কাজের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফলাফল আশা করা আপনার আত্মবিশ্বাসকে চাঙ্গা করে তোলে। আপনাকে ব্যাপক ভাবে অনুপ্রেরিত করে। আর আপনার ভিতরে যদি এই দুইটা জিনিশ বিদ্যমান থাকে তাহলে সেই স্থানে অলসতার কোন ঠাই থাকে না। এবং আত্মবিশ্বাস এবং অনুপ্রেরণা থাকলে সে কাজে সাফল্য আসিবেই। যার যাদের সাফল্য লাভের তাড়না থাকে তারা কখনো অলসতাকে প্রশ্রয় দেয় না। অন্যদিকে যাদের ফলাফলের আগেই তাদের কাজের ফলাফলের প্রতি নেতিবাচক চিন্তা করে তাদের অনুপ্রেরণা এবং আত্মবিশ্বাস এই দুটোই হারিয়ে যায় ফলে তারা কাজ শুরুর করতে পারে না। এবং তাদেরকে অলসতা নিজ চাদরে মুড়িয়ে নেয়। তাই অলসতার প্রাচীর ভাঙতে আপনাকে অবশ্যই আপনার কাজের ফলাফল নিয়ে ইতিবাচক চিন্তা করতে হবে।

৬। নিজেকে সময় বেধে দিন
আমাদের মস্তিষ্ক ক্রিয়াশীল রাখতে তাকে তাড়া দেওয়া প্রয়োজন। আর তার জন্যই কোন কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে গেলে আপনাকে নিজেকেই একটা সময় বেধে দেওয়া প্রয়োজন। এবং সংকল্প করা প্রয়োজন যে এই সময়ের মধ্যেই আপনাকে কাজটা শেষ করতে হবে। তাহলে কাজ করতে কাজটা যেমন অনুপ্রেরণা পাওয়া যায় যেমনি অলসতাও ভয়ে পালিয়ে যায়। কিন্তু আপনি যদি সময় বেধে না দেন তাহলে আপনার কাজে ডিসিপ্লিন থাকবে না। মনে হিবে আজ থাক, কালকে ঠিক কাজটা করে নেব, আবার কালকেও মনে হবে আজ থাক কালকে করে নেব। এই কালটা কখনই আসে না, কিভাবেই বা আসবে আপনাকে যে অলসতা নামক রোগে তার সুতায় পেঁচিয়ে ফেলেছে। যার ফলে কাজটা আপনার অসম্পূর্ণই থেকে যায়। তাই আপনার কাজটাকে অলসতামুক্ত ভাবে সম্পন্ন করতে হলে আপনার অবশ্যই এই পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে।

৭। একটি নির্দিষ্ট লক্ষ নিয়ে কাজ করুন
লক্ষবিহীন কাজ কখনো এগোয় না। আর সেই কাজের মাঝে অনেক ফাক থাকে, তাই আপনার সেই কাজের ক্ষেত্রে তিক্ততা চলে আসে যেটা পরে অলসতায় রূপান্তরিত হয়। আর এই অলসতাই আপনার আত্মবিশ্বাস কে গুড়িয়ে দিতে একাই যথেষ্ট। কিন্তু আপনার কাজে যদি এমটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ মজুত থাকে তাহলে আপনার সেই কাজের ক্ষেত্রে আপনা আপনই একটা ঝোক চলে আসবে। সেটা কাজ করার জন্য অত্যন্ত জরুরী। আর আমরা জানি যে লক্ষই হল সাফল্য লাভের প্রথমম ধাপ। তাই কাজে সাফল্য আয়নে যেমন এইটা আপনাকে সাহায্য করবে, ঠীক তেমনি লক্ষটাকে ছোঁয়ার প্রায়শ আপনার অলসতাকে দূর করবে।

৮। গান শুনুন এবং তাল মেলান
রাস্তায় যানজটে বসে থাকার সময় এবং অতিরিক্ত কাজের চাপে নিজের পছন্দের গান শোনা যেতে পারে বা গুনগুন করে গাইতে পারেন। মনোবিজ্ঞানিরা গবেষণায় দেখছেন, যখন প্রাণ খুলে গান গাওয়া হয় বা পছন্দের গানের সঙ্গে তাল মেলানো হয় তখন শরীরে সুখের হরমোন নিঃসরণের পরিমান বৃদ্ধি পায়। তবে এক্ষেত্রে শুধু শুনলেই চলবে না, ভালো ফল পেতে চাইলে তাল মেলাতে হবে।

৯। ধৈর্য ধরুন
বৃষ্টি, আবহাওয়া খারাপ, যেতে ইচ্ছে করছেনা বা সময় নেই-এর মতো কোনো অজুহাত চলবে না কিন্তু! লম্বা দিনের মাত্র কয়েকটা মিনিট বা ঘণ্টাখানেক সময় নিজের শরীরে জন্য খরচ করুন৷ মাসখানেক পর দেখবেন ধীরে ধীরে আনন্দ পাচ্ছেন৷ এভাবেই একসময় সোশ্যাল মিডিয়ার আগ্রহ খানিকটা কমে যাবে এবং ক্ষতিকারক দিকগুলো থেকে স্বাভাবিক নিয়মেই নিজে বেরিয়ে এসেছেন৷ তখন টেরই পাবেন না যে অলসতা কোথায় পালিয়ে গেছে!

১০। নিজেকে পুরস্কৃত করুন
এটাকে ইংরেজিতে Reward ও বলা হয়। অর্থাৎ কোন কাজের বিনিময়ে কোন পুরস্কার পাওয়া। আমরা তখনই একটা কাজ মন দিয়ে করি যখন ওই কাজের বিনিময়ে আমরা কিছু লাভ করি। সেই কাজের ক্ষেত্রেও আমাদের মনযোগ তুঙ্গে থাকে। তাই কোন কঠিন কাজকে সহজে সম্পন্ন করতে হলে আপনি নিজেকে নিজে পুরুস্কার দিতে পারেন। তাহলে আপনার কাজে উৎসাহ আসবে। ধরুন আপনার পড়তে একদমই ভালোলাগে না কিন্তু আপনি যদি নিজেকে নিজে প্রমিস করেন প্রতিদিন ১ টা চ্যাপ্টার শেষ করতে পারেন তাহলে আপনি ওই সপ্তাহের শুক্রুবার আপনার একটি পছন্দের জিনিশ খেতে যাবেন। ধরুন আপনার পছন্দের খাবার বিরিয়ানি। তারমানে প্রত্যেকদিন যদি আপনি একটা চ্যাপ্টার শেষ হয় তাহলে আপনি ওই সপ্তাহের শুক্রুবার বিরিয়ানি খেতে যাবেন। এই পদ্ধতি আপনার কাজে গতি আনবে এবং অলসতা জানালা দিয়ে পালাবে।

তথ্যসূত্র: বিডিমোটিভেটর ডটকম।

Check for details
SHARE